মানব সভ্যতার সকল উন্নয়ন ও অব্যহত অগ্রগতির মধ্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত এবং অনুচ্চারিত বিষয় হচ্ছে মানুষের বার্ধক্য। বার্ধক্য হচ্ছে এমন এক ক্রমক্ষয়িষ্ণু শারীরিক প্রক্রিয়া যা বয়স বৃদ্ধির ক্রমধারায় অনেকটা অদৃশ্যভাবে আবির্ভূত হয় এবং মানুষকে শারীরিকভাবে দুর্বল, অচল ও অসহায় করে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। জাতীয় প্রবীণমালা-২০১৩ অনুসারে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীরা হলেন প্রবীণ। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ২০১৪ সালে এঁদেরকে জ্যেষ্ঠ নাগরিক ঘোষণা করেছেন।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ক্রমবর্ধমান অংশ হচ্ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। দেশের চলমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ প্রবীণকেই দুর্বল স্বাস্থ্য, বহুবিধ বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় এবং সৃজনশীল কাজ করার যোগ্যতা ও সামর্থ্য প্রবীণদের যে রয়েছে তা বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যায়।
বস্তুতঃ কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের অবস্থান ও মর্যাদা হারানোর সমূহ সম্ভাবনা, উপার্জন কমে যাওয়া, বার্ধক্যের নিরাপত্তাহীনতা এবং বঞ্চনা তাঁদেরকে ক্রমান্বয়ে বিষন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। প্রবীণদের অসহায়ত্ব কমিয়ে এনে সমাজের উৎপাদনক্ষম, শক্তিশালী এবং সম্মানজনক সদস্য হিসেবে সমাজজীবনের মূল স্রোতধারায় প্রতিষ্ঠিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী আজ জোরেশোরে উত্থাপিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ (প্রায় ৮%) প্রবীণ । তবে তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা (প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ) খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং বৃদ্ধির হারও বেশ উদ্বেগজনক। ১৯১১, ১৯৫১, ১৯৭৪, ১৯৯১, ২০০১ এবং ২০১১ সালের লোকগণনা জরিপে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী (৬০ বৎসর বা তদূর্ধ্ব)ছিল যথাক্রমে ১৩ লক্ষ ৭০ হাজার, ২৮ লক্ষ ৬০ হাজার, ৪৯ লক্ষ, ৬০ লক্ষ পাঁচ হাজার, ৭০ লক্ষ এবং ৯৫ লক্ষ। পাশাপাশি, ধারণা করা হচ্ছে যে, ২০২৫, ২০৫০ এবং ২০৬১ সালে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়াবে যথাক্রমে ১ কোটি ৮০ লক্ষ, ৪ কোটি পঞ্চাশ লক্ষ এবং ৫ কোটি ৬১ লক্ষ। বস্তুতঃ প্রবীণজনসংখ্যা বৃদ্ধির এই ধরণ সমাজ তথা সার্বিকভাবে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ওপর যে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশে প্রবীণদের তুলানায় প্রবীণাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। পুুরুষদের চেয়ে নারীদের গড় আয়ু ও বৈধব্য বেশি, আয়-উপার্জনের সুযোগ খুবই কম, উত্তরাধিকার স¤পত্তি-দেনমোহর-স¤পদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা ভীষণ দুরূহ এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে তাঁরা অনেকভাবেই সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের প্রবীণ-প্রবীণারা যাতে তাঁদের বাকি জীবন হাসিখুশি এবং সন্তুষ্টির মধ্যদিয়ে অতিবাহিত করতে পারেন সে লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সন্মান, সেবা ও সহযোগিতা প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বার্ধক্য পরিস্থিতির পরিণতি ও ভয়াবহতা অনুধাবন করে অধ্যাপক ডাঃ এ কে এম আব্দুল ওয়াহিদ ১৯৬০ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (বাইগাম) নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তৎকালীণ গভর্নর মোঃ জাকির হোসেন, বিচারপতি আব্দুল জব্বার খান, বিচারপতি মোঃ আছির, বিচারপতি সৈয়দ এ বি এম মাহমুদ হোসেইন, ড. এম কুদরত-ই-খোদা, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. হেদায়েতউল্লাহ, ড. এম এ জব্বার, সৈয়দ ইত্তেহাদ আলী, সৈয়দ মুর্তজা আলী, জনাব পানাউল্লাহ আহমেদ, জনাব আব্দুর রহমান, মিসেস আখতার ইকবাল বেগম, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহীম, জনাব আলমগীর এম এ কবির, জনাব জামাল উদ্দিন আহমেদ, ডাঃ এম এ ওয়াহিদ এবং আরো অনেকে এই সংগঠন গোড়ে তোলার ব্যাপারে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখেন। মূলতঃ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের কল্যাণে বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে জন্য কাজ করে যাওয়া দেশের প্রাচীনতম এবং সর্ববৃহৎ সংগঠন হচ্ছে আজকের এই বাইগাম। এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী, অলাভজনক, অরাজনৈতিক, বেসরকারী সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান যা বাংলাদেশের সকল শ্রেণির প্রবীণদের কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছে।

