অধ্যাপক ডাঃ এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডাঃ এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ’র জন্ম ১৮৯৮ সালের ২৮ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা মৌলভী আবদুল ওয়াছেক এবং দাদা ছিলেন ডাঃ আব্দুল দৈয়ান। মায়ের নাম ছিল মোসাম্মৎ জামিলা খাতুন। ডাঃ ওয়াহেদ বশিরহাট হাইস্কুল হতে সরকারী বৃত্তি পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক, কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে আই.এস.সি এবং বি.এস.সি. পাশ করেন। ১৯১৯ সালে বি.এস.সি. পরীক্ষায় ফিজিওলজিতে অসাধারণ ফলাফল করায় তিনি স্বর্ণপদক এবং হাজী মুহাম্মদ মহসীন মেধাবৃত্তি লাভ করেন। কলকাতা মেডিকেল কলেজ হতে তিনি ১৯২৪ সালে এম.বি. ডিগ্রী লাভ করেন। কলকাতা মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে তিনি তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি লন্ডনে যান এবং ১৯৩৯ সালে এডিনবার্গ হতে এম.আর.সি.পি. ডিগ্রী লাভ করেন এবং ঐ একই সময়ে তিনি গ্লাসগো হতে এফ.আর.এফ.পি. এন্ড সি. ডিগ্রীও অর্জন করেন।

অধ্যাপক ডাঃ এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলিম এম.আর.সি.পি. ডিগ্রীধারী প্রফেসর অব মেডিসিন। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত তিনি কলকাতার লেক মেডিকেল কলেজের মেডিসিনের অধ্যাপক ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক এবং পরবর্তীতে অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ডাঃ ওয়াহেদ ১৯৫৫-৫৮ সময়ে পাকিস্তানের পেশওয়ার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খ্যাতনামা চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৫৮-১৯৬০ সময়কালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করেন।

মেডিসিনের অধ্যাপক এবং দেশে-বিদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যাপনা ও প্র্যাকটিস করার সুবাদে ডাঃ ওয়াহেদ মানুষের দৈহিক ও মানসিক জ্বরা প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। এ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তাছাড়া দেশের মানুষের বার্ধক্যজনিত অবস্থা ও সমস্যা, প্রতিকার-প্রতিরোধ ও করণীয় এবং রাষ্ট্রিক-সামাজিক প্রস্তুতি পর্যায় তাঁকে যথেষ্টভাবে ভাবিত করে তোলে। তিনি উৎকন্ঠিত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হয়ে সংগঠিত হয়ে বার্ধক্য মোকাবেলার উদ্যোগ নিতে সক্রিয় হোন। কর্মস্থল হতে অবসর গ্রহণ করে এ বিষয় তিনি তাঁর বন্ধুমহলের সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। সমাজদরদী এ সকল মানুষের প্রত্যক্ষ ও আন্তরিক সহযোগিতা নিয়ে ১৯৬০ সালের ১০ এপ্রিল তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “পাকিস্তান এ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা এইজেড” বা পাকিস্তান প্রবীণ হিতৈষী সংঘ। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি ‘বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা এইজেড এন্ড ইনষ্টিটিউট অব জেরিয়েট্রিক মেডিসিন’ বা ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’ নামে পরিচিত। ডাঃ ওয়াহেদ সংঘের গোড়াপত্তন করেন ঢাকায় তাঁর ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কের ৭৮ নম্বর নিজ বাড়ির একটি অংশে নিজের আসবাবপত্র এবং নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-লিংগ নির্বিশেষে সকল প্রবীণের নিজস্ব এ ধরনের সংগঠন ছিল পাকিস্তানে প্রথম এবং উপমহাদেশ তথা বিশ্বে হাতে গোনা কিছু প্রবীণ কল্যাণ সংগঠনের অন্যতম। শুরুতেই এ কাজে সহযোগিতার নিদর্শনস্বরুপ দশ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান দিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জনাব জাকির হোসেন। তিনি ছিলেন ডাঃ ওয়াহেদের ঘনিষ্ট বন্ধু।

এছাড়া বিচারপতি আব্দুল জব্বার খান, বিচারপতি মোঃ আছির, বিচারপতি সৈয়দ এ বি এম মাহমুদ হোসেইন, ড. এম. কুদরত-ই-খুদা, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. হেদায়েত উল্লাহ, ড. এম এ জব্বার, সৈয়দ ইত্তেহাদ আলী, সৈয়দ মুর্তজা আলী, জনাব পানাউল্লাহ আহমেদ, জনাব আব্দুর রহমান, মিসেস আখতার ইকবাল বেগম, বেগম শামুছুন্নাহার মাহমুদ, ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহীম এবং ডাঃ এম এ ওয়াহিদ এর সক্রিয় সহযোগিতা ও আন্তরিক সমর্থনের কথা অবশ্যই আমাদের কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণে রাখতে হবে।

মানুষের বার্ধক্য আসে প্রথমত ও প্রধানত তার নিজের শরীরে। এত দিনের আদর-সোহাগে লালিত দেহযন্ত্র আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ৪০ বছর বয়সের পর হতেই ব্যক্তির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে। মনের ইচ্ছা, আকুতি আর নির্দেশনা পালনে এরা ক্রমশ শৈথিল্য দেখাতে থাকে। ফলে দেখা দেয় নানা ধরণের রোগ, ব্যাধি এবং অসুস্থতা। সঙ্গত কারণেই বার্ধক্যে পৌঁছে মানুষ চায় শারীরিক সুস্থতা এবং হৃত যৌবন আর বল ফিরে পেতে। এক্ষেত্রের ত্রাতা যেহেতু চিকিৎসকরা, তাই প্রবীণরা দেহে-মনে ভাল থাকতে ডাক্তার বা চিকিৎসকদের স্মরণাপন্ন হন। এই পর্যবেক্ষণ এবং উপলদ্ধিতে ডাঃ ওয়াহেদ সংঘের প্রথম ও প্রধান কর্মসূচি হিসেবে চিকিৎসা সেবার দ্বার উন্মোচন করেন। আগত রোগীদের তিনি নিজে দেখতেন, পরামর্শ দিতেন এবং প্যাথলজি পরীক্ষাও নিজেই করতেন। তাছাড়াও তিনি বার্ধক্য বিষয়ে বহু গবেষণা করেছেন। বার্ধক্য বিষয়ে সমৃদ্ধ নানা লেখা নিয়ে “পাকিস্তান জার্নাল অব জেরিয়েট্রিক্স” নামে ত্রৈমাসিক একটি পত্রিকাও তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ করা শুরু হয়। জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ বর্ষ ঘোষনা করেছিল এবং এর শ্লোগান ছিল ‘সোসাইটি ফর অল এইজেস’ বা “সমাজ হোক সকল বয়সীর জন্য সমান উপযোগী” বিচক্ষণ ডাঃ ওয়াহেদ এ বিষয়টি তিন যুগ আগেই উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সংঘের সদস্যপদ সকল বয়সীর জন্যেই উন্মুক্ত রেখেছিলেন। এমনকি সংঘের নানাবিধ কাজ কর্মে তিনি তাঁর পরিবারের সকল শ্রেণির সদস্যদের সহযোগিতা নিতেন। জীবদ্দশায় তিনি তাঁর যাবতীয় মূল্যবান বইপত্র এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের দুলর্ভ নমুনা ও যন্ত্রপাতি প্রবীণ হিতৈষী সংঘকে দান করে যান। তাঁর সুযোগ্য প্রয়াত পুত্রদ্বয় সর্বজনাব আব্দুল জব্বার ও আব্দুস সাত্তার এবং কন্যা মিসেস তৌহিদা খাতুন আমৃত্যু প্রবীণ হিতৈষী সংঘের অবিচ্ছেদ্য কর্মীর ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাছাড়া বর্তমানে তাঁর একমাত্র জীবিত কন্যা মিসেস তৈয়বা খাতুন এবং জামাতা দেশ বরেন্য বক্তিত্ব প্রয়াত জামাল উদ্দিন আহমেদের অবদান প্রবীণ হিতৈষী সংঘ কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। এমনকি ডাঃ ওয়াহেদের তৃতীয় প্রজন্ম পৌত্র জনাব তৌহীদ বিন মুজাফফরসহ সকল পরিবার সদস্য সংঘের উন্নয়ন তথা দেশের প্রবীণদের সেবায় নিয়োজিত আছেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ডাঃ ওয়াহেদ মানবকল্যাণে নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন। বিশেষ করে ১০ এপ্রিল ১৯৬০ থেকে ২৬ আগষ্ট ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি সংঘের মহাসচিবের দায়িত্বে প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২ সেপ্টেম্বর জনদরদী ও প্রবীণ হিতৈষী এই মহান ব্যক্তিত্ব জান্নাতবাসী হন।